সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩১ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (ICE) গত সপ্তাহে এসব বাংলাদেশিকে “অবৈধভাবে অবস্থান” ও “ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের” অভিযোগে আটক করে এবং পরে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ফেরত পাঠানো এই ৩১ জন বাংলাদেশি মূলত বিভিন্ন সময় পর্যটক, শিক্ষার্থী ও কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। তবে নির্ধারিত সময়ের পরও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। তাদের কেউ কেউ আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, যা প্রত্যাখ্যাত হয়। এছাড়াও কয়েকজনকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় উভয়েই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ফেরত পাঠানোর এই প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান অভিবাসন সংক্রান্ত সমঝোতা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই ধরনের ফেরত পাঠানোর ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে, বিশেষ করে যারা এখনো ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজকর্মী জাকির হোসেন বলেন, “এই ঘটনা আমাদের সবার জন্য একটা সতর্কবার্তা। যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তাদের উচিত এখনই আইনগত পরামর্শ নেওয়া।”
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আইনে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীরা বলছেন, যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন, তাদের উচিত অবিলম্বে ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। রাজনৈতিক আশ্রয়, পারিবারিক স্পনসরশিপ বা অন্য কোনো আইনি উপায় থাকলে দ্রুত আবেদন করা উচিত।
একজন অভিবাসন আইনজীবী জানান, “অনেকেই মনে করেন সময়ের সাথে সাথে বৈধতা পাওয়া যাবে, কিন্তু সেটি সব সময় সম্ভব হয় না। বরং আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া দীর্ঘদিন অবস্থান করলে তা ডিপোর্টেশনের ঝুঁকি বাড়ায়।”

বাংলাদেশ সরকার বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে অভিবাসন সম্পর্কিত চুক্তির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে সরকার ফেরত আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের বিষয়েও উদ্যোগ নিচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা চেষ্টা করছি যাতে ফেরত আসা ব্যক্তিরা পুনরায় সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাদের কাউন্সেলিং ও ট্রেনিংয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।”
সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপ করছে, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো থেকে যাওয়া অভিবাসীদের জন্য হুমকিস্বরূপ। আবার অনেকে মনে করেন, অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থান করাই মূল সমস্যা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “অবৈধ অভিবাসন রোধে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় ও নৈতিক বার্তা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর এই সাম্প্রতিক ঘটনা অভিবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। যারা বৈধভাবে বিদেশে অবস্থান করতে চান, তাদের উচিত প্রাসঙ্গিক আইন ও নিয়ম মেনে চলা এবং প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া। একই সঙ্গে সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত জনসচেতনতা বাড়ানো এবং যারা ফেরত আসছেন, তাদের জন্য সহানুভূতিশীল ও কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
0 Comments